শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত হলো ইসলাম ধর্মের একটি পবিত্র ও ফজিলতপূর্ণ রাত, যা হিজরি ক্যালেন্ডারের শাবান মাসের ১৫তম রাতে পালিত হয়। এ রাতকে মুসলিম বিশ্বে গুনাহ মাফ, রহমত ও তাকদির লেখার রাত হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শবে বরাতের অর্থ ও গুরুত্ব
শবে বরাত শব্দটি ফারসি ও আরবি ভাষার সমন্বয়ে গঠিত।
- “শব” অর্থ রাত
- “বরাত” অর্থ মুক্তি বা ভাগ্য নির্ধারণ
এটি “লাইলাতুল বরাত” নামেও পরিচিত, যার অর্থ “মুক্তির রাত”। ইসলামের বিভিন্ন হাদিস ও ইতিহাস অনুযায়ী, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের গুনাহ ক্ষমা করেন, রহমত বর্ষণ করেন এবং পরবর্তী বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করেন।
শবে বরাতের ফজিলত ও কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিতে
শবে বরাতের ব্যাপারে সরাসরি কুরআনে উল্লেখ নেই, তবে কিছু ব্যাখ্যাকারী মনে করেন যে, সূরা আদ-দুখান (৪৪:৩-৪)-এর আয়াতে এই রাতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে—
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
“নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এই রাতে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়।”
— (সূরা আদ-দুখান: ৩-৪)
অনেক ইসলামী চিন্তাবিদের মতে, এখানে বলা “বরকতময় রাত” বলতে শবে কদরের রাত বোঝানো হয়েছে। তবে শবে বরাত সম্পর্কিত বিভিন্ন হাদিস পাওয়া যায়, যার মধ্যে কয়েকটি হলো—
১. গুনাহ মাফের রাত
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,
“আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের পনেরোতম রাতে প্রথম আকাশে নেমে আসেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরির পশমের পরিমাণের চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।”
— (তিরমিজি: ৭৩৯, ইবনে মাজাহ: ১৩৮৯)
২. তাকদির নির্ধারণের রাত
হজরত ইকরিমাহ (রহ.) বলেন,
“শবে বরাতের রাতে আগামী এক বছরের জন্য রিজিক, মৃত্যু ও জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।”
— (তাফসিরে ইবনে কাসির)
৩. ইবাদতের গুরুত্ব
আবু মুসা আশআরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত,
“শাবান মাসের পনেরোতম রাতে আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।”
— (ইবনে মাজাহ: ১৩৯০)
শবে বরাতের করণীয় আমল
শবে বরাতের রাতটি ইবাদত, তওবা, দোয়া ও আল্লাহর রহমত লাভের রাত। এই রাতে করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো—
১. নফল নামাজ আদায় করা
রাসুল (সাঃ) রাতের ইবাদতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। শবে বরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। কেউ চাইলে ২, ৪, ৬, ৮ বা ১২ রাকাত নফল নামাজ পড়তে পারেন।
২. কুরআন তিলাওয়াত
এই রাতে কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত সূরা ইয়াসীন, সূরা মূলক ও সূরা দুখান তিলাওয়াত করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
৩. তওবা ও দোয়া করা
শবে বরাত গুনাহ মাফের রাত। তাই এ রাতে আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তেগফার করা উচিত। এ জন্য আপনি বলতে পারেন—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও দয়ালু।”
৪. কবর জিয়ারত করা
রাসুল (সাঃ) শবে বরাতের রাতে জান্নাতুল বাকির কবরস্থানে গিয়ে দোয়া করতেন। তাই এই রাতে স্বজনদের কবর জিয়ারত করা ও তাদের জন্য দোয়া করা সুন্নত।
৫. রোজা রাখা (পরের দিন)
শবে বরাতের পরের দিন ১৫ শাবান রোজা রাখা মুস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—
“শাবান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখো, কেননা এটি আমার মাস।”
— (নাসাঈ: ২৩৫৮)
শবে বরাত সম্পর্কে ভুল ধারণা
অনেক মুসলিম সমাজে শবে বরাত নিয়ে কিছু ভুল ধারণা ও বিদআত প্রচলিত রয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা অনুযায়ী নয়। যেমন—
🚫 পটকা ফাটানো বা আতশবাজি করা – এটি ইসলামে নিষিদ্ধ এবং শবে বরাতের মূল উদ্দেশ্য নয়।
🚫 মসজিদে গণজিকির বা বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা – রাসুল (সাঃ) শবে বরাতের রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত করতেন, জনসমাবেশ করতেন না।
🚫 বিশেষ ধরনের খাবার রান্না করা (হালুয়া-রুটি জরুরি মনে করা) – শবে বরাতের জন্য কোনো বিশেষ খাবারের নির্দেশনা ইসলামে নেই।
উপসংহার
শবে বরাত হলো একটি মহিমান্বিত রাত, যা আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। এটি গুনাহ মাফের রাত, যেখানে ইবাদত, দোয়া ও তওবা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
✅ এই রাতে বেশি বেশি ইবাদত করুন।
✅ গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।
✅ বিদআত ও কুসংস্কার এড়িয়ে চলুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শবে বরাতের ফজিলত লাভের তৌফিক দান করুন এবং গুনাহ থেকে মুক্তি দিন। আমিন! 🤲
আপনার যদি আরও কোনো প্রশ্ন থাকে বা বিশেষ কিছু জানতে চান, তবে জানাতে পারেন! 😊